২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার পর ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বিচারকাজ। দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে বিচারকাজ ঝুলে রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মামলার বিচার খুব শিগগিরই শেষ হবে এবং ভিকটিম ও তার পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা করতে গিয়ে অনেক ভুল-ত্রুটি হয়েছে। যার কারণে এতদিনেও মামলাটির রায় হয়নি বলে দাবি করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ওই হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলাটির বর্তমানে সাক্ষীদের জেরা চলছে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সবশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর মামলাটিতে দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর জেহাদ হোসেনকে জেরার তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দিন জেরা হয়নি। আগামী ১০ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। ওইদিন এই মামলার পলাতক আসামি কাইয়ুম কমিশনার আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে তা মঞ্জুর করেন আদালত। ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর জেহাদ হোসেন সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। এখন পর্যন্ত মামলাটিতে ৭০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পাল জানান, ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার হত্যা মামলার বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। মামলাটিতে এখন দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর জেহাদ হোসেনের জেরা চলছে। রাষ্ট্রপক্ষ বিচার শেষ করতে সব সময় তৎপর ছিল। মামলাটির বিচারে আসামিপক্ষ কিছুটা কালক্ষেপণ করেছে। তাদের কালক্ষেপণের কারণে বিচারকাজ শেষ করতে দেরি হয়েছে। বাকি আর একজন তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে মামলাটি যুক্তিতর্কে পর্যায়ে চলে আসবে। এরপর রায় ঘোষণা করবেন আদালত। মামলাটির বিচার শেষ হতে কেন এত বিলম্ব হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে এই আইনজীবী বলেন, আসামিপক্ষ ইচ্ছে করে সময় নিয়েছে। একাধিক বিচারক পরিবর্তন হয়েছে। সাক্ষী ঠিকমত আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় বিচার শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই মামলার বিচার শেষ হবে এবং ভিকটিম ও তার পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকল আসামির সর্বোচ্চ সাজার দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী। এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা করতে গিয়ে অনেক ভুল-ত্রুটি হয়েছে। যার কারণে এতদিনেও মামলাটির বিচার শেষ হয়নি। কারণ রায় দিলে আসামিরা খালাস পাবে। এজন্য সরকারের বিশেষ নির্দেশনায় মামলাটা আটকে ছিল। সাক্ষী নেওয়া হলেও বিচার শেষ করেনি। মামলায় দেখিয়েছে, যে গুলিতে তাবেলা সিজার মারা গেছে আর যে অস্ত্র উদ্ধার দেখিয়েছি তার ফরেনসিক রিপোর্ট ভিন্ন। যার কারণে রায় যখনই দেবে, আসামিদের খালাস দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, মামলায় কাইয়ুম কমিশনার ও তার ভাই মতিনকে আসামি করা হয়। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে আসামিদের জোর করে ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করিয়েছে। মামলা নিয়ে সরকারের দুই সংস্থা ডিবি পুলিশ ও র?্যাব ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। চলতি মাসে কারাগারে থাকা চার আসামি জামিনের আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। নতুন করে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আশা করছি, আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন। এই মামলা থেকে সকলেই খালাস পাবেন। অন্যান্য আসামির পক্ষের আরেক আইনজীবী এস এম শওকত হোসেন মিয়া জানান, আমরা এই পর্যন্ত যতগুলো সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি, রাষ্ট্রপক্ষ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আশাবাদী, আসামিরা নিশ্চয় ন্যায়বিচার পাবেন। অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়, তবু তাদের এই মামলায় ভিন্ন উদ্দেশ্য জড়ানো হয়েছে। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আসামিদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করবো। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশান ৯০ নম্বর সড়কের পশ্চিম প্রান্তে গুলশান এভিনিউ সংলগ্ন গভর্নর হাউজের দক্ষিণের দেওয়াল ঘেষা ফুটপাতে দুর্বৃত্তরা তাবেলা সিজারকে গুলি করে। ওই সময় স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইসিসিও কো-অপারেশনের বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি হেলেন দার বিক বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করা হয়। ২০১৬ সালের ২৮ জুন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এম এ কাইয়ুমসহ সাত জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক গোলাম রাব্বানী। একই বছরে ২৪ আগস্ট তৎকালীন মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণ করেন। চার্জশিটভুক্ত অপর আসামিরা হলেন- কাইয়ুমের ভাই আবদুল মতিন, তামজিদ আহমেদ ওরফে রুবেল, রাসেল চৌধুরী, মিনহাজুল আরেফিন ওরফে ভাগনে রাসেল, শাখাওয়াত হোসেন ও সোহেল। আসামিদের মধ্যে তামজিদ আহমেদ, রাসেল চৌধুরী, মিনহাজুল, মতিন ও শাখাওয়াত আদালতে বিভিন্ন সময়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। চার্জশিটভুক্ত আসামি কাইয়ুম ও সোহেল পলাতক। মতিন জামিনে এবং বাকি চার আসামি কারাগারে রয়েছে। মামলার চার্জশিট থেকে জানা যায়, হামলাকারীদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল একজন শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করে দেশ-বিদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এই পরিকল্পনা করা হয়। আসামি সোহেলের কাছ থেকে পিস্তল ভাড়া নিয়ে খুনিরা তাবেলা সিজারকে হত্যা করে। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত আসামি মতিনের নির্দেশে শাখাওয়াতের মোটরসাইকেল নিয়ে মিনহাজুল, তামজিদ ও রাসেল চৌধুরী গুলশান ২-এর ৯০ নম্বর সড়কে যান। ওই সড়কের গভর্নর হাউজের সীমানা প্রাচীরের বাইরে ফুটপাতে নিরিবিলি ও অন্ধকার জায়গায় তামজিদ গুলি করে তাবেলা সিজারকে (৫১) হত্যা করেন। তাকে সহায়তা করেন রাসেল চৌধুরী ও মিনহাজুল।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার হত্যার ৯ বছরেও শেষ হয়নি বিচার
- আপলোড সময় : ২৯-০৯-২০২৪ ১২:৪৫:২৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০৯-২০২৪ ১২:৪৫:২৭ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ